বরিশাল বিভাগ বাংলাদেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের একটি। ১৯৯৩ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ছয়টি জেলা নিয়ে এই বিভাগের যাত্রা শুরু হয়। এ প্রশাসনিক অঞ্চল পূর্বে ঢাকা বিভাগ (১৮২৯-১৯৬০) ও খুলনা বিভাগ (১৯৬০-১৯৯২) এর অন্তর্গত ছিল। এই বিভাগের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ও বড় জেলা গুলো যথাক্রমে বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর, এ বিভাগে বরগুনাকে ইলিশের জেলা বলা হয় আর পটুয়াখালী কে সাগরকন্যা বলা হয়।
ইতিহাস
আধুনিক বরিশাল বিভাগের এলাকা প্রাচীনকালে বঙ্গ ও গঙ্গারিডাই সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। প্রাচীন ঐতিহাসিক বঙ্গভূমি, যা বর্তমানের বরিশাল বিভাগে অবস্থিত ছিল। এই অঞ্চলটি প্রাচীন বঙ্গ জনজাতির প্রধান আবাসস্থল ছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর ৬ষ্ঠ শতকে এ অঞ্চল গৌড়রাজ্যের অধীনস্থ হয়। পরবর্তী সময়ে প্রারম্ভিক মধ্যযুগে এ অঞ্চলে খড়্গ, পাল, চন্দ্র ও বর্মণ রাজবংশ শাসন করেছে। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলকে ‘বাঙ্গালা’ নামে পরিচিত ছিল, যেখান থেকে মধ্যযুগে অপভ্রংশ হয়ে ‘বাকলা’ নামটি এসেছে বলে মনে করা হয়। সেন যুগের শিলালিপি অনুসারে আধুনিক বরিশালকে ‘অনুত্তর বঙ্গ’ (দক্ষিণ বঙ্গ) নামে ডাকা হতো, যা তৎকালীন বঙ্গ অঞ্চলের এক প্রশাসনিক বিভাগ ছিল। সেন রাজবংশের পতনের পর ১২–১৩ শতকে বরিশাল দেব রাজবংশের শাসনে আসে।
প্রাচীনকালে বরিশাল অঞ্চল বহু দ্বীপ ও চর মিলে গঠিত জলাভূমির সমষ্টি ছিল, যা ব্রহ্মপুত্র–গঙ্গা–মেঘনা নদী ব্যবস্থার পলিমাটি দ্বারা গঠিত হয়েছিল।
১৩শ শতকের শুরুতে মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি বরিশাল জয় করেন এবং অল্প সময় পর মুহাম্মদ বিন তুঘলক পূর্ববঙ্গ সম্পূর্ণ জয় করেন। উত্তর-পশ্চিম বঙ্গের হিন্দু প্রধানরা ক্ষমতা হারিয়ে বরিশাল অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে ‘বাকলা’ নামে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
মোগল আমলে হিন্দু সমাজ উত্তর ও পশ্চিম বরিশাল (বাকেরগঞ্জ) এলাকায় বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল। বরিশালের দক্ষিণাংশ তখনও জঙ্গল ও হ্রদময় ছিল। ব্রিটিশ শাসনের প্রারম্ভিক জনগণনায় বাকেরগঞ্জে উত্তর-পশ্চিম অংশই ছিল এমন এলাকা যেখানে হিন্দু জনসংখ্যা মুসলমানদের চেয়ে বেশি ছিল।
১৭শ শতকের শেষ ও ১৮শ শতকের শুরুতে বরিশাল দ্বিতীয় দফা জনবসতির ঢেউ দেখে, এবার নেতৃত্বে ছিল মুসলিম বসতি স্থাপনকারীরা। ১৭শ শতকের শুরুতে ঢাকা মোগল সুবাহ বাংলার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বরিশাল অঞ্চল (মোগলদের কাছে ‘সরকার বাকলা’) আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি নাগালে আসে। কিন্তু আরাকানী ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের কারণে প্রশাসন গভীর অঞ্চলে অগ্রসর হতে সমস্যায় পড়ে।
১৬৬৬ সালে মোগল নৌবাহিনী মেঘনা মোহনা জলদস্যুমুক্ত করার পর বরিশাল অঞ্চলে বসতি স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। জমি উন্নয়নকারীরা সরকারের কাছ থেকে তালুক গ্রহণ করে জমি চাষের আওতায় আনে এবং এরা ‘তালুকদার’ নামে পরিচিতি লাভ করে। পরে এ তালুকের রাজস্ব জমিদারদের মাধ্যমে দেওয়ানদের নিকট পৌঁছাত।
আরেক ধরনের উন্নয়ন ব্যবস্থায় মুসলিম পীর বা কাজিরা সরাসরি জঙ্গল অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে, স্থানীয় মানুষকে সংগঠিত করে জমি পরিষ্কার করে এবং পরে মোগল প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। সব ক্ষেত্রে সম্পর্ক ভালো থাকত না, কারণ পীরদের প্রভাব ছিল সাধারণ জনগণের ওপর, প্রশাসনের ওপর নয়। উদাহরণস্বরূপ, বাকেরগঞ্জের পূর্বাঞ্চলের ঝালকাঠি থানায় বহু পীরের বিশেষ প্রভাব ছিল। তাঁদের মধ্যে সাইয়্যিদ ফকির এবং ফয়েজুস আহমেদ খান (একজন পারস্য বণিক ও শিক্ষাবিদ, যিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে খাইবার পাস দিয়ে ভারতে এসে শিক্ষার প্রচার করেন) বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের নামেই সাইয়্যিদপুর, হিজলা ও মুলাদী গ্রামের নামকরণ হয়। ১৯০৬ সালের এক জরিপে দেখা যায়, জনগণ পীরকে ‘গাইড’ মনে করত এবং নবাবকে ভাড়া দিত না। ফলে লালা চেত সিং নামে গভর্নরের এক সহকারী পীরকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেন।
১৭৯৭ সালে এ অঞ্চল বিবেকগঞ্জ (বাকেরগঞ্জ) জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, পরে নাম হয় বরিশাল জেলা। হিজলা–মুলাদীর পীর ফয়েজুস আহমেদ খান সেখানেই স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলেন।
১৯৪৮ সালে বাকেরগঞ্জ জেলার একাংশের নামকরণ হয় বরিশাল জেলা এবং অপরাংশ পটুয়াখালী জেলা, যা খুলনা বিভাগের পাঁচটি জেলারের একটি ছিল।
১৯৯৩ সালে ১লা জানুয়ারি অবিভক্ত বাকেরগঞ্জকে 'বরিশাল' নামে একটি প্রশাসনিক বিভাগ বানানো হয়। অতীতে 'বরিশাল' মূলত বাকেরগঞ্জের জেলা সদর অঞ্চলটির নাম ছিল।
ভৌগোলিক অবস্থান
এই বরিশাল বিভাগ এর পশ্চিমে খুলনা বিভাগ, পূর্বে চট্টগ্রাম বিভাগ, উত্তরে ঢাকা বিভাগ এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবস্থিত।
প্রশাসনিক বিভাজন
এই বিভাগের মোট জেলার সংখ্যা ৬টি।
নদ-নদী
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জালের ন্যায় নদী ছড়িয়ে আছে; বরিশাল বিভাগেও তেমনই নদ-নদীর সংখ্যা প্রচুর। এই বিভাগের উল্লেখযোগ্য নদ-নদীসমূহ হচ্ছে কীর্তনখোলা, মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, ধানসিঁড়ি, পায়রা নদী ,বিষখালী নদী সন্ধ্যা নদী ও বলেশ্বর নদী।
ধর্ম
বরিশাল বিভাগে মুসলিম ও হিন্দুসহ কিছু সংখ্যক খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মের লোকজন একত্রে বসবাস করে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
এই বিভাগের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় , এটি শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ। এ বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাফল্য। এছাড়া বরগুনা সরকারি কলেজ ও বরগুনা জিলা স্কুল বিখ্যাত৷
আধুনিক মাদরাসা শিক্ষার এক যুগান্তকারী বিস্ময়, মাদরাসা বোর্ডের শীর্ষে ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদরাসা প্রখ্যাত দার্শনিক, সমাজ সংষ্কারক হযরত মাওলানা মুহাম্মদ আযীযুর রহমান নেছারাবাদী কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ. ১৯৫০ সালে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশে হাফেজ ছাত্রদের জন্য একমাত্র স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান দারুল কায়েদ তাহিলী মাদরাসা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মাওলানা মুহাম্মদ খলিলুর রহমান নেছারাবাদী হুজুর প্রতিষ্ঠা করেন।
চরমোনাই জামিয়া রশিদিয়া ইসলামিয়া বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী বিদ্যাপীঠ। এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯২৪ সালে সৈয়দ মুহাম্মদ ইসহাক প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রথমে আলিয়া মাদ্রাসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৮২ সালে সৈয়দ ফজলুল করিম মাদ্রাসার কওমী শাখা চালু করেন।
বর্তমানে উভয় শাখার শিক্ষাদান করা হয়।
কওমী শাখার আচার্য সৈয়দ রেজাউল করিম ও আলিয়া শাখার আচার্য সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী।
ব্রজমোহন কলেজ বরিশাল বিভাগের সবচেয়ে প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এটি ১৮৮৯ সালে অশ্বিনীকুমার দত্ত প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে উচ্চ শিক্ষার জন্য বরিশাল বিভাগে দুটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়), দুইটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অফ গ্লোবাল ভিলেজ), দুটি সরকারি মেডিকেল কলেজ (শের-এ-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়, পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ) একটি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বরিশাল টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ) ও একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বরিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রয়েছে। এছাড়াও প্রতি জেলায় উচ্চ শিক্ষার জন্য বেশ কয়েকটি কলেজ ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট রয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বরিশাল বোর্ডে ২০টি সরকারি কলেজ সহ মোট কলেজের সংখ্যা ৩০৯টি।
উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ - ১৪ আগস্ট ২০২৩), মোফাসসিরে কোরআন, সাবেক সংসদ সদস্য ।
আবদুর রহিম- ইসলামি পণ্ডিত, ইসলামি রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং লেখক তিনি একজন অনুবাদক হিসেবেও সর্বজন স্বীকৃত।
বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর - বীরশ্রেষ্ঠ পদকপ্রাপ্ত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ।
বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল - বীরশ্রেষ্ঠ পদকপ্রাপ্ত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ।
নেছারউদ্দীন আহমদ - পীর ও ধর্ম প্রচারক ।
আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ - পীর, শিক্ষাবিদ, ধর্ম প্রচারক ।
আযীযুর রহমান কায়েদ - দার্শনিক ও সমাজ সংষ্কারক
সৈয়দ মুহাম্মদ ইসহাক পীর ও রাজনীতিবীদ ।
আবুল কাশেম ফজলুল হক - রাজনীতিবীদ ।
সৈয়দ ফজলুল করিম - পীর ও রাজনীতিবীদ ।
সৈয়দ রেজাউল করিম - পীর ও রাজনীতিবীদ ।
সৈয়দ ফয়জুল করিম - ইসলামী পন্ডিত ও রাজনীতিবীদ ।
মুহাম্মদ মিজানুর রহমান - সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক ।
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া - সাংবাদিক ।
অশ্বিনীকুমার দত্ত - রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও সাহিত্যিক ।
জীবনানন্দ দাশ - কবি ।
সুফিয়া কামাল - কবি ।
কামিনী রায় - কবি ।
কুসুমকুমারী দাশ - কবি ।
আহসান হাবীব - কবি ।
মোহাম্মদ কেরামত আলী - রাজনীতিবীদ, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক ।
লোকমান হোসেন মিয়া - সিনিয়র সচিব গণপ্রজাতন্ত্রী ।বাংলাদেশ, নির্বাহী চেয়ারম্যান বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ।
আবদুল গাফফার চৌধুরী- গ্রন্থকার, কলাম লেখক
ওসমান হাদি - রাজনীতিবিদ ও সাংস্কৃতিক কর্মী
