· মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ · ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ ·
নিউজ →
জেলা · ঢাকা বিভাগ

শরীয়তপুর

Shariatpur

শরীয়তপুর জেলার ৬টি উপজেলা

শরীয়তপুর জেলা বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের একটি প্রশাসনিক জেলা। পূর্বে এটি মাদারীপুর মহকুমার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭৯ সালে মাদারীপুরের পূর্বাংশ নিয়ে শরীয়তপুর মহকুমা গঠিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ইতিহাস

প্রাচীনকালে এ অঞ্চল তথা তৎকালীন ফরিদপুর জেলার অংশ মাদারীপুর মহকুমার নাম ছিলো ইদিলপুর যা কোটালিপাড়া অথবা চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। পরবর্তীতে বিক্রমপুরের অধীনে নাম ছিলো কেদারপুর। বারোভূঁইয়ার বিপ্লবী চাঁদ রায় ও কেদার রায় (মৃ: ১৬০৩), দক্ষিণ বিক্রমপুরের আড়া ফুলবাড়িয়ায় (বর্তমান নদীতে বিলীন নড়িয়া উপজেলার অংশ) জন্মগ্রহণ করেন। কেদার রায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রায়পুর নামের গ্রামটি। তাদের রায়বংশ অনুসারেই নাম হয়েছিলো রায়পুর যা কয়েক শতাব্দী ধরে ছিলো। সেই গ্রামের নাম এখন পুটিজুরি। আজ আর চাঁদ রায়, কেদার রায়দের কোন চিহ্নমাত্র নেই সেখানে। শুধু পাশের গ্রামে তাদের খনন করা দুটি বিশাল দীঘি রয়ে গেছে। এখনো দিগম্বরী দেবীর পূজা হয় সেখানে। তাই এই দিঘীগুলোর বর্তমান নাম দিগম্বরীর দীঘি। শুধু এই দীঘি দুটিই পদ্মার এপারে বারো ভূঁইয়া কেদার রায়কে মনে রেখেছে। পদ্মায় ভেসে গেছে রায়পুরের ইতিহাস। কেদার রায়ের খনন করা দিগম্বরীর দীঘির একটু দূরেই এখনও কিছু পোড়া ইট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা বাড়ি। সেখানে এখন অন্য লোকের বসতি। স্থানীয় লোকেরা বাড়িটাকে বলে ‘ভিয়া বাড়ি’। ধারণা করা হয় ‘ভুঁইয়া বাড়ি’ মানুষের মুখে মুখে অপভ্রংশ হতে হতে ‘ভিয়া বাড়ি’ হয়ে গেছে।

কেদার রায় কেদারপুরে বাসস্থান তৈরী করতে চেয়েছিলেন। কিছু কাজ সমাপানান্তে তার মৃত্যু হওয়াতে তা পরিত্যক্ত হয়। বাড়ির চতুষ্পার্শ্বে যে পরিখা খনন করতেছিলেন তার ভগ্নাবশেষ এখনও রয়েছে। ইহাকে কেদার রায়ের বাড়ির বেড় (পরিখা) বলে।

ফতেজঙ্গপুরে মান সিংহর নেতৃত্বাধীন মোঘল বাহিনী ও রাজা কেদার রায়ের প্রতিরোধকারী বাহিনীর মধ্যে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়। প্রাচীন নাম শ্রীনগর। মুঘল সেনাপতি মানসিংহ যখন বিক্রমপুর আক্রমণ করেন তখন তার সহযোগী যোদ্ধাগণ এখানকার রাজা কেদার রায় কর্তৃক পরাস্ত হয়ে শ্রীনগরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মানসিংহ তাদেরকে উদ্ধারের জন্য তার সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। ফলে প্রচন্ড যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। তিনি মোগলদের জয়ের চিহ্ন স্বরুপ মানসিংহ সেখানে ফতেজঙ্গপুর দুর্গ নির্মাণ করেন এবং শ্রীনগরের নাম পরিবর্তন করে ফতেজঙ্গপুর রাখেন। এখানে নাককাটা বাসুদেবের প্রস্থর মূর্তি আছে। তথাপি কেদার রায়ের মৃত্যুর পর সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার গভর্ণর ইসলাম খার (১৬০৮-১৬১৩) সময়েই মূলতঃ এ দেশে মুগল রাজত্বের ভিত্তি হয়। তখন হতেই মাদারিপুর অঞ্চলসহ বাংলার এ এলাকা মুগলদের পতন পর্যন্তই তাদের দখলে ছিল। ইসলাম খানের পর একুশজন গভর্নর ১৬১৩ হতে ১৭৫৭ পর্যন্ত এ অঞ্চল শাসন করেন। ১৭৫৭ সালের সেই পলাশির মর্মান্তিক পরিণতির পূর্ব পর্যন্ত নবাব সিরাজউদ্দৌলা বাংলার স্বাধীন নওয়াব হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।

পলাশীর যুদ্ধে লর্ড ক্লাইভ সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করার পর ১৭৬৫ সালে এ জেলা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সৃষ্ট প্রশাসনের আওতায় নিয়ে আসা হয়। শরীয়তপুর সহ ফরিদপুরের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে ঢাকা নিয়াবত গঠন করা হয়। ঢাকা নিয়াবত একজন নায়েব সুবাদার বা নাইব নাজিম ঢাকাকে কেন্দ্রস্থল হিসেবে গঠন করে শাসন পরিচালনা করেন।

শরীয়তপুর জেলা পূর্বে বৃহত্তর ফরিদপুর এর অংশ ছিলো। ১৮৬৯ সালে প্রশাসনের সুবিধার্থে ইহাকে বাকেরগঞ্জ জেলার অংশ করা হয়। কিন্তু এ অঞ্চলের জনগণের আন্দোলনের মুখে ১৮৭৩ সালেই এ অঞ্চলকে মাদারীপুর মহকুমার অন্তর্গত করে আবার বৃহত্তর ফরিদপুরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

ভাইসরয় লর্ড কার্জনের সময় ১৯০৫ সালে বাংলাকে দু‘টো ভাগে বিভক্ত করা হয়। এ বিভক্ত বাংলার ইতিহাসে সুদুর প্রসারী ফল বিস্তার লাভ করে।

এর পর ক্রমে ক্রমে শরীয়তপুরের অঞ্চল সহ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে স্বাধীনতা সংগ্রামের সুত্রপাত হয়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয় রাজনৈতিক দলের কর্মীরাই এ জেলায় সক্রিয় ছিলেন। এমনকি ১৯১০ হতে ১৯৩৫ সালের দিকে এ অঞ্চলের বহু বিপ্লবী সক্রিয়ভাবে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে ভারতের স্বাধীনতার জন্য অংশ নেন। লোনসিংএ জন্মগ্রহণকারী বিপ্লবী পুলিনবিহারী দাস এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।

১৯৪৭ সালর ১৪ই আগস্ট হতে ১৯৭১ সালের ১৫ই ডিসেম্বর পর্যন্ত তৎকালীন ফরিদপুর জেলা বর্তমানে শরীয়তপুর সহ এ প্রদেশ ছিল পাকিস্তানেরই একটি অংশ।

শাসনিক সুবিধার্থে মাদারীপুরের বৃহৎ পূর্বাঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক মহকুমা গঠনের প্রয়াস ১৯১২ সাল হতেই নেয়া হয়েছিলো। এর পরে পাকিস্তান সৃষ্টিও বাংলাদেশের অভ্যুদয় নতুন প্রশাসনিক দৃষ্টি ভঙ্গি গঠন করতে সহায়তা করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় মাদারীপুরের পূর্বাঞ্চল নিয়ে একটি নতুন মহকুমা গঠিত হবে। বিষয় নির্বাচনী কমিটির সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক, ব্রিটিশ বিরোধী তথা ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়ত উল্লাহর নামানুসারে এর নাম করণ হয় শরীয়তপুর এবং এর সদর দপ্তরের জন্য পালং থানা অঞ্চলকে বেছে নেয়া হয়। ১৯৭৭ সালের ১০ ই আগস্ট রেডিওতে সরকার কর্তৃক মহকুমা গঠনের ঘোষণা দেয়া হয় এবং ঐ বছরের ৩রা নভেম্বর এ মহকুমার আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন করেন তৎকালীন উপদেষ্টা জনাব আবদুল মোমেন খান। প্রথম মহকুমা প্রশাসক ছিলেন জনাব আমিনুর রহমান। এর পর রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোঃ এরশাদ সরকারের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ফলে শরীয়তপুর মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর করা হয়। ৭ই মার্চ ১৯৮৩ সালে জেলা গঠনের ঘোষণা হয়। ১৯৮৪ সালের ১লা মার্চ শরীয়তপুর জেলার শুভ উদ্বোধন করেন তৎকালীন তথ্য মন্ত্রী জনাব নাজিম উদ্দিন হাশিম। বর্তমান শরীয়তপুর বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা। শরীয়তপুরের আধুনিক চরাঞ্চলের জনক বলা হয় সৈয়দ আমির খসরু সাহেব কে । উনার বর্তমান বাড়ী ডি এম খালী ইউনিয়নস্থ চর পাইয়াতলী ।

অবস্থান ও আয়তন

শরীয়তপুর জেলার আয়তন ১১৪৫.০০ বর্গকিলোমিটার। এই জেলার উত্তরে মুন্সীগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে বরিশাল জেলা, পূর্বে চাঁদপুর জেলা, পশ্চিমে মাদারীপুর জেলা। গড় তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে ৩৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস গড় বৃষ্টিপাত ২১০৫ মি মি।

এটি মূলত চর এলাকা।

প্রশাসনিক এলাকাসমূহ

শরীয়তপুর জেলা ৬টি উপজেলা, ৮টি থানা, ৬টি পৌরসভা, ৬৫টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৫৪টি ওয়ার্ড, ৯৩টি মহল্লা, ১,২৩০টি গ্রাম এবং ৬০৭টি মৌজা নিয়ে গঠিত।

শিক্ষা

শরীয়তপুরে ৭৭২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৯টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৮৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়(যার মধ্যে আটটি সরকারি) এবং ৪২টি মাদ্রাসা রয়েছে। এছাড়াও ৩টি সরকারি এবং ১৩টি বেসরকারি কলেজ, ১টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ১টি ভোকেশনাল স্কুল ও কলেজ, ১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে।

শরীয়তপুর সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

শরীয়তপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

জেড এইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মধুপুর, কার্তিকপুর, ভেদরগঞ্জ, শরীয়তপুর

মনোয়ারা সিকদার মেডিকেল কলেজ, মধুপুর, কার্তিকপুর, ভেদরগঞ্জ, শরীয়তপুর

শরীয়তপুর সরকারি মহিলা কলেজ

সরকারি শামসুর রহমান কলেজ, গোসাইরহাট, শরীয়তপুর

পালং তুলাসার গুরুদাস সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়

শরীয়তপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

অর্থনীতি

এই জেলায় বসবাসকারী মানুষের বেশির ভাগ কৃষিকাজের সাথে যুক্ত। উৎপাদনশীল শস্যের মধ্যে রয়েছে ধান, পাট, গম, পিঁয়াজ, মিষ্টি আলু, টমেটো প্রভৃতি। এর মধ্যে পাট, পিঁয়াজ, আদা, টমেটো প্রধান রপ্তানী পণ্য হিসেবে বিবেচিত।

শ্রমিক সংগঠন

শরীয়তপুর জেলা স্যানিটারি মিস্ত্রী কল্যাণ সমিতি

শিল্প ও বাণিজ্য

এই জেলায় শিল্প কারখানা তেমন গড়ে উঠেনি। বর্তমানে এ জেলায় নিম্নোক্ত শিল্পগুলো আছে:

পূর্বে এই জেলা কাশা ও পিতলের তৈজসপত্র তৈরীর জন্য বিখ্যাত ছিলো।

পত্র-পত্রিকা

সাপ্তাহিক শরীয়তপুর সংবাদ

যোগাযোগ ব্যবস্থা

স্থল ও জলপথ উভয়েই রাজধানীর সাথে সংযুক্ত। স্থল পথে শরীয়তপুর সদর থেকে ঢাকা (ভায়া পদ্মা সেতু- মুন্সিগঞ্জ)। শরীয়তপুর জেলা থেকে স্থলপথে মাদারীপুর, বরিশাল , ফরিদপুর জেলার সাথে সংযুক্ত। এছাড়াও জলপথে নড়িয়া থেকে ঢাকা এবং নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ থেকে চাঁদপুর জেলা সংযুক্ত।

ভাষা ও সংস্কৃতি

বাংলা ভাষাই এখানের প্রধান ভাষা। এ এলাকার মানুষের সংস্কৃতি বাঙ্গালিদের অনুরূপ।

দর্শনীয় স্থান

পন্ডিতসার চিশতীনগর দরবার শরীফ

ভোজেশ্বরের শিবলিঙ্গ - উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় শিবলিঙ্গ

সখিপুর আনন্দবাজার বেরিবাধ

বুড়িরহাট ঐতিহাসিক (জমিদার বাড়ি) হাওলাদার বাড়ি