খুলনা বিভাগ বাংলাদেশের আটটি বিভাগের মধ্যে একটি এবং এটি দেশের দক্ষিণ পশ্চিম দিকে অবস্থিত। ১৯৬০ সালে বর্তমানের ১৬টি (তৎকালীন ৪টি) জেলা নিয়ে খুলনা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে খুলনা বিভাগের আয়তন ২২,২৮৫ বর্গকিলোমিটার (৮,৬০৪ বর্গমাইল)। ২০২২ সালের আদমশুমারী অনুয়ায়ী খুলনা বিভাগের জনসংখ্যা ১,৭৪,১৫,৯২৪।
প্রতিষ্ঠাকাল এবং ইতিহাস
ব্রিটিশ ভারতে খুলনা বিভাগ ছিল প্রেসিডেন্সি বিভাগের একটি অংশ। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের আগে প্রেসিডেন্সি বিভাগে ছয়টি জেলা ছিল, মুর্শিদাবাদ, কলকাতা, চব্বিশ পরগনা, খুলনা, যশোর এবং নদিয়া। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় প্রেসিডেন্সি বিভাগ দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এবং খুলনা, যশোর ( বনগাঁ মহকুমার বনগাঁ ও গাইঘাটা থানা ব্যতীত), নদীয়া জেলার পূর্বাংশ( কুষ্টিয়া মহকুমা, কৃষ্ণগঞ্জ থানা ব্যতীত চুয়াডাঙ্গা মহকুমা, মেহেরপুর মহকুমার মেহেরপুর ও গাংনী থানা) পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় । ১৯৪৮ সালে অবিভক্ত নদিয়া জেলার পূর্বাংশ নতুন কুষ্টিয়া জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। । পূর্ব পাকিস্তান সরকার অবিভক্ত যশোর, অবিভক্ত খুলনা জেলা ও নবগঠিত কুষ্টিয়া জেলাকে রাজশাহী বিভাগে যুক্ত করে। ১৯৬০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার রাজশাহী বিভাগের কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনা জেলা এবং ঢাকা বিভাগের বাকেরগঞ্জ জেলা নিয়ে খুলনা বিভাগ নামে নতুন বিভাগ গঠন করে । ১৯৬৯ সালের ১ জানুয়ারি বাকেরগঞ্জ জেলা থেকে নতুন পটুয়াখালী জেলার সৃষ্টি করা হয় ফলে খুলনা বিভাগে জেলার সংখ্যা ৪ থেকে ৫ এ দাঁড়ায়। ১৯৯৩ সালে খুলনা বিভাগ থেকে বৃহত্তর বাকেরগঞ্জ-পটুয়াখালী অঞ্চল আলাদা করে নতুন বরিশাল বিভাগ গঠন করা হয় ।
ভৌগোলিক অবস্থান
খুলনা বিভাগ এর পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সীমানা, উত্তরে রাজশাহী বিভাগ, পূর্বে বরিশাল বিভাগ এবং দক্ষিণে বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ নামে পরিচিত সুন্দরবন সহ বঙ্গোপসাগরেরগা ঘেষে রয়েছে নয়নাভিরাম সমুদ্র সৈকত এবং দ্বীপপুঞ্জ।দশটি জেলা সমৃদ্ধ এই বিভাগ পদ্মা নদী এর ব-দ্বীপ বা গ্রেটার বেঙ্গল ডেল্টার একটি অংশবিশেষ। অন্যান্য নদীর মধ্যে রয়েছে মধুমতি নদী, ভৈরব নদ, কপোতাক্ষ নদ, কুমার নদ, চিত্রা নদী, রুপসা নদী, পশুর নদী ইত্যাদি।
প্রশাসনিক বিভাজন
খুলনা বিভাগ ৫৯টি উপজেলা (উপবিভাজন) ও নিম্নলিখিত ১০টি জেলা (জিলা) নিয়ে গঠিত হয়েছে:
শিল্প
খুলনা বিভাগ শিল্পে সমৃদ্ধ একটি বিভাগ।
খুলনা বিভাগের প্রধান সমৃদ্ধ জেলা হল:
খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, যশোর, বাগেরহাট ও খুলনা জেলাতে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য জেলা গুলোতে কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
দর্শনীয় স্থান
ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের একটি। মসজিদটি বাগেরহাট সদর উপজেলায় অবস্থিত। ধারনা করা হয় মসজিদটি ১৫শ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছে।
শিলাইদহ কুঠিবাড়ি কুষ্টিয়া জেলার শিলাইদহে অবস্থিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থান। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে থাকার সময় অনেক সাহিত্য রচনা করেছিলেন। ১৯১২ সালে এখানে থাকার সময় তিনি গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের কাজ শুরু করেছিলেন। ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ এখানে থেকে একটি গান লিখেছিলেন যা বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত।
লালন শাহের মাজার কুষ্টিয়া নগরের পূর্ব দিকে ছেউড়িয়াতে অবস্থিত লালনের সমাধিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি মাজার। ১৮৯০ সালে লালন মারা যান। ১৯৬৩ সালে মাজারটি নির্মাণ করা হয়। প্রতিবছর লালনের জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে লালন মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ ও স্মৃতি কমপ্লেক্স
মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরে অবস্থিত একটি স্মৃতিস্তম্ভ। মুজিবনগর বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী (অস্থায়ী)। ১৯৮৭ সালে স্মৃতিস্তম্ভ ও ১৯৯৬ সালে স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ রা হয়।
মধুপল্লী যেখানে ১৮২৪ মাইকেল মধুসূদন দত্ত জন্মগ্রহণ ও শৈশব অতিবাহিত করেছেন যা বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মধুপল্লী যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে অবস্থিত। এখানে ১৯৮৪ সালে মাইকেল মধুসূদন স্মৃতি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতু
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতু কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা ও পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলায় অবস্থিত দুইটি সেতু। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক রেলসেতু যার নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯০৯ সালে এবং ১৯১৫ সালে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় চার্লস হার্ডিঞ্জের নামানুসারে এই রেলসেতুর নামকরণ করা হয়। লালন শাহ সেতুর উদ্বোধন হয় ২০০৪ সালে। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগের জন্য এই সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কুষ্টিয়ার বিখ্যাত বাউল সাধক লালনের নামানুসারে সেতুটির নামকরন করা হয়েছে।
