· মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ · ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ ·
নিউজ →
জেলা · খুলনা বিভাগ

ঝিনাইদহ

Jhenaidah

ঝিনাইদহ জেলার ৬টি উপজেলা

ঝিনাইদহ জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল।

ইতিহাস

ঝিনাইদহ যশোর জেলার একটি মহকুমা ছিল। ঝিনাইদহ জেলাটি ১৮৬২ সালে মহকুমা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে এটি একটি পৃথক জেলা হয়।

এই জেলার নামকরণ সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি। কথিত আছে যে, ক্যালসিয়াম উৎপাদনের জন্য '‘নবগঙ্গা’' নদী এবং '‘দহা’' নদী থেকে ঝিনুক সংগ্রহের জন্য এই এলাকা বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। এই জেলার নাম ঝিনাইদহ “ঝিনুক”এবং “দাহ”শব্দদ্বয় থেকে নেয়া হয়েছে বলে মনে করা হয়। মধ্যযুগে, বাংলার সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ-এর নামে নামকৃত টাকশাল শহর মুহাম্মদাবাদ, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে অবস্থিত ছিল।

নামকরণ

প্রাচীনকালে বর্তমান ঝিনাইদহের উত্তর পশ্চিম দিকে নবগঙ্গা নদীর ধারে ঝিনুক কুড়ানো শ্রমিকের বসতি গড়ে ওঠে বলে জনশ্রুতি আছে। সে সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতা থেকে ব্যবসায়ীরা ঝিনুকের মুক্তা সংগ্রহের জন্যে এখানে ঝিনুক কিনতে আসতো। সে সময় ঝিনুক প্রাপ্তির এই স্থানটিকে ঝিনুকদহ বলা হতো। সে সময় ঝিনুক থেকে মুক্তা সংগ্রহের মাধ্যমে এবং ঝিনুক পুড়িয়ে চুন তৈরি এবং তা বিক্রি করে মানুষ অর্থ উপার্জন করতো। অনেকের মতে ঝিনুককে আঞ্চলিক ভাষায় ঝিনেই, ঝিনাই এবং দহ অর্থ বড় জলাশয় ও ফার্সি ভাষায় দহ বলতে গ্রামকে বুঝানো হতো। সেই অর্থে ঝিনুকদহ বলতে ঝিনুকের জলাশয় অথবা ঝিনুকের গ্রাম বুঝাতো। আর এই ঝিনুক এবং দহ থেকেই ঝিনুকদহ বা ঝিনেইদহ, যা- রূপান্তরিত হয়ে আজকের ঝিনাইদহ নামকরণ হয়েছে।অন্য কিংবদন্তি থেকে জানাযায়, এক ইংরেজ সাহেব এই এলাকা দিয়ে নৌকাযোগে নবগঙ্গা নদী পার হচ্ছিলেন। অনেক লোকজন তখন নদী থেকে ঝিনুক সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত ছিল। উপস্থিত লোকদের কাছে সাহেব তখন এলাকাটির নাম জানতে চান। লোকেরা তার কথা বুঝতে না পেরে ভেবে নেন যে নদী থেকে তারা কি জিনিস তুলছে তার নাম জানতে চাচ্ছেন। এই মনে করে লোকেরা সাহেবকে বলেন ঝিনুক বা ঝিনেই। এতে ইংরেজ সাহেব ধরে নেন জায়গাটির নাম ঝেনি। এই ঝেনি শব্দটি পরে ঝেনিদা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ঝিনাইদহকে আঞ্চলিক ভাষায় এখনও ঝিনেদা বলা হয়। ঝেনিদা, ঝিনেদা আর ঝিনাইদহ যাই বলা হোক না কেন ঝিনাইদহ নামের উৎপত্তি যে ঝিনুক থেকে তা এ অঞ্চলের মানুষের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য।ঐতিহ্যবাহী ঝিনাইদহ গ্রন্থে ঝিনাইদহ সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘‘বারো আউলিয়ার আশীর্বাদপুষ্টঃ গাজী-কালু-চম্পাবতীর উপাখ্যানধন্য; কে.পি. বসু, গোলাম মোস্তফার স্মৃতিবিজড়িত; বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, বিপ্লবী বীর বাঘাযতীনের শৌর্যময়; খেজুর গুড়, কলা-পানের প্রাচুর্যমণ্ডিত; পাগলাকানাই, লালন শাহের জম্মস্থান, কপোতাক্ষ, বেগবতী, চিত্রা, নবগঙ্গার ঝিনুকদহ এক কথায় নাম তার ঝিনাইদহ।’’ ঝিনাইদহের নামকরণের ন্যায় এর অপর ৫টি উপজেলারও রয়েছে নাম করনের বৈচিত্রময় ইতিহাস। শৈলকুপাঃশৈলকুপার কুমার নদীতে একসময় নাকি প্রচুর পরিমাণে শৈলমাছ পাওয়া যেত এবং তা সাধারণ কুপিয়ে মারা হতো। এজন্যেই এর নাম হয় শৈলকুপা। আবার অন্যদের মতে এখানে শৈলগুল্প বেশি থাকার কারণে এ অঞ্চলকেব শৈলকুপা নামে অভিহিত করা হয়। শৈলকুপা বহু পূর্বে ফরিদপুর জেলার মধ্যে ছিল।মহেশপুরঃভৈরবের তীরে অবস্থিত মহেশপুর উপজেলার আদিনাম যোগীদহ। পরবর্তীতে ১১০৭ সালে হিন্দু দেবতা মহেশপুর ঠাকুরের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আদিনাম পরিবর্তিত হয়ে মহেশপুর হয়। কেউ কেউ বলেন রাজা মহেশ চন্দ্রের নামানুসারে এলাকার নাম মহেশপুর হয়। অন্য জনশ্রুতি হল ঐ অঞ্চলের রাজত্ব এক জেলে রাজার হস্তগত হলে তার ছেলে ‘‘মহেশ’’ এর নামানুষারে মহেশপুর নামকরণ হয়। মহেশপুর ভারতের বনগাঁও মহাকুমার একটি অন্যতম অংশ ছিল। ১৯৪৭ সালে মহেশপুর ঝিনাইদহ মহাকুমার অন্তর্গত হয়। মহেশপুরকে খাদ্যভাণ্ডার বা রত্নভাণ্ডার বলা হয়।কালীগঞ্জঃকালীগঞ্জ উপজেলার নামকরণের পিছনে জনশ্রুতি আছে তা হলো এই বাজারে বিখ্যাত কালিমন্দিরকে অবলম্বন করেই কালীগঞ্জ নাম করন হয়।কোটচাঁদপুরঃজনশ্রুতি আছে, জঙ্গলে ঘেরা এ অঞ্চলে চাঁদফকির নামের এক দরবেশ আস্তানা গড়েন। তার নামে এর নাম হয় চাঁদপুর। মোঘল আমলে ১৬১০ সালে একটি কোর্ট নির্মিত হয়। আর চাঁদপুর নামের আগে কোট শব্দটি বসিয়ে এর নাম হয় কোটচাঁদপুর। ব্রিটিশ আমলে এখানে কোর্ট ছিল এবং ১৮৬২ সাল পর্যন্ত এটি মহকুমা বাণিজ্য নগরী হিসেবে খ্যাত ছিল।হরিণাকুন্ডুঃলোকমুখে প্রচার আছে ‘‘অভয়কুন্ড নামে এক ইংরেজ কর্মচারীর অত্যাচারী পুত্র হরিচরণ কুণ্ডুর নামানুসারে এ অঞ্চলের নাম হয় হরিণাকুন্ডু ।

অবস্থান ও আয়তন

ভৌগোলিক বিস্তৃতি ২৩° ১৩' উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২৩° ৪৬' উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত এবং ৮৮° ৪২' পূর্ব দ্রাঘিমা হতে ৮৯° ২৩' পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত। জেলার আয়তন ১৯৬৪.৭৭ বর্গ কিলোমিটার(৭৫৮.৬০ বর্গ মাইল)। ঝিনাইদহ জেলার উত্তরে কুষ্টিয়া জেলা, দক্ষিণে যশোর জেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, পূর্বে রাজবাড়ী জেলা ও মাগুরা জেলা, পশ্চিমে চুয়াডাঙ্গা জেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। ৭টি নদ-নদী প্রবাহিত এ জেলার মধ্য দিয়ে: বেগবতী নদী, ইছামতী, কোদলা, কপোতাক্ষ নদ, নবগঙ্গা নদী, চিত্রা নদী ও কুমার নদ। এ অঞ্চলের জলবায়ু উষ্ণ প্রকৃতির ও সমভাবাপন্ন। বার্ষিক গড় তাপমাত্রা ২২.২৪° সেলসিয়াস। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১৫২.১৯০ সেন্টিমিটার।

প্রশাসনিক এলাকাসমূহ

এই জেলা ৬টি উপজেলা, ৬৭ টি ইউনিয়ন, ৯৪৫ টি মউজা, ১১৪৪ টি গ্রাম, ৬টি পৌরসভা, ৫৪ টি ওয়ার্ড এবং ১৩৬ টি মহল্লা নিয়ে গঠিত।

ঝিনাইদহ জেলার উপজেলা গুলো হল:

সংসদীয় আসন

এ জেলায় সংসদীয় আসন ৪টি-

জনসংখ্যা

বাংলাদেশের ৬ষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২ অনুযায়ী, ঝিনাইদহ জেলার জনসংখ্যা হল ২০,০৫,৮৪৯ জন। জনসংখ্যার ঘনত্ব হল ১,০২১ জন/বর্গ কিমি। পুরুষ হল জনসংখ্যার ৫০.০৪% এবং মহিলা ৪৯.৯৬%। মুসলমানরা জনসংখ্যার ৯০.৩৯%, হিন্দু ৯.৪৮%, খ্রিস্টান ০.০৬% এবং অন্যান্যরা হল ০.০৮%। সাত বছর বা তার উপরের বয়সীদের মধ্যে ঝিনাইদহে সাক্ষরতার হার ৭২.৮১%।

নদ-নদী

ঝিনাইদহ জেলায় অনেকগুলো নদ নদী রয়েছে। নদ-নদীগুলো হচ্ছে কপোতাক্ষ নদ, নবগঙ্গা নদী, গড়াই নদী, কুমার নদ, ডাকুয়া নদী, বেতনা নদী, চিত্রা নদী, ভৈরব নদ ও বেগবতী নদী।

প্রধান ফসল ও ফলমূল

ধান, পান, পাট, গম, আখ, সরিষা,মরিচ, রসুন, পেঁয়াজ, বিভিন্ন ধরনের ডাল শাকসবজি হলো এই এলাকার প্রধান ফসল।

তাছাড়াও প্রধান ফলমূলের মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, কলা, পেয়ারা, লিচু, নারকেল, খেজুর, তাল, ড্রাগন ইত্যাদি। পাট, ধান, রসুন, পেঁয়াজ, পটল, খেজুর গুড়, পান পাতা প্রয়োজন মিটিয়ে রপ্তানি করা হয়।

অর্থনৈতিক অবস্থা

ঝিনাইদহের অর্থনীতি সাধারণত কৃষির উপর নির্ভর্শীল। ৬৬.৫০% বাড়িতে নানা ধরনের ফসল ফলিয়ে থাকেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ধান, পাট, আখ, গম, শাকসবজি,মসলা, ডাল। এছাড়াও ফলমুলের মধ্যে রয়েছে আম, পেয়ারা, কাঁঠাল, কলা, লিচু, নারকেল, খেজুর, তাল ইত্যাদি। এছাড়াও অন্যান্য খাত যেমন প্রবাসী, সরকারী চাকুরীজীবী, গার্মেন্টস কর্মীরাও এখানকার অর্থনীতিতে অনেক অবদান রাখছে।

দর্শনীয় স্থান ও স্থাপনা

নলডাঙ্গা রাজবাড়ি রিসোর্ট এন্ড পিকনিক স্পট

বারোবাজার প্রত্নতাত্ত্বিক মসজিদ

ধান্য হাড়িয়া পূর্বপাড়া জামে মসজিদ, ধান্য হাড়িয়া, যাদবপুর, মহেশপুর।

দত্তনগর কৃষি ফার্ম,মহেশপুর(এন্ডিজ)

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব

জয়গোপাল তর্কালঙ্কার, সাহিত্যিক

জামাল নজরুল ইসলাম, বিখ্যাত গণিতবিদ ও পদার্থ বিজ্ঞানী

বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠ

বাঘা যতীন, ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী

লতিফুর রহমান, বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা

খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, ইসলামি ব্যক্তিত্ব

ইলা মিত্র, তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতা

মুস্তফা মনোয়ার, চিত্রশিল্পী

এস.এম মনিরুজ্জামান, ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, আইন মন্ত্রী

রুহুল কুদ্দুস কাজল, বাংলাদেশের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল