· মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ · ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ ·
নিউজ →
বাংলাদেশের সেরা · ঐতিহ্য ও শিল্প

মসলিন

muslin

ঢাকাই মসলিন — একসময় পৃথিবীর সূক্ষ্মতম কাপড়

মসলিন বিশেষ এক ধরনের তুলার আঁশ থেকে প্রস্তুতকৃত সূতা দিয়ে বয়ন করা এক প্রকারের অতি সূক্ষ্ম কাপড়বিশেষ। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মসলিন উৎপাদন করা হত; তবে অবিভক্ত বাংলার প্রধান উৎপাদন ক্ষেত্র ছিল ঢাকা, মুর্শিদাবাদ ও শান্তিপুর। এছাড়াও মালদা ও হুগলিতে মসলিন উৎপাদিত হত। ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে উৎপাদিত মসলিন ছিল উৎকৃষ্ট মানের, যা ঢাকাই মসলিন নামে সুবিদিত। নদীয়ার শান্তিপুরে উৎপাদিত বিখ্যাত মসলিন শান্তিপুরী মসলিন হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছিল, যা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃকও স্বীকৃত ছিল। ঢাকায় ফুটি কার্পাস নামক তুলা থেকে প্রস্তুত অতি চিকন সুতা দিয়ে মসলিন তৈরি করা হত, অপরদিকে মালদা, রাধানগর ও বর্ধমানে নুরমা বা কৌর নামক তুলা থেকে প্রস্তুত সূক্ষ্ম সুতা দিয়ে মসলিন তৈরি করা হত। চড়কা দিয়ে কাটা, হাতে বোনা মসলিনের জন্য সর্বনিম্ন ৩০০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার করা হত যার ফলে মসলিন হত কাচের মত স্বচ্ছ। এই মসলিন রাজকীয় পোশাক নির্মাণে ব্যবহার করা হত। মসলিন প্রায় ২৮ রকম হত যার মধ্যে জামদানী এখনও ব্যাপক আকারে প্রচলিত। ইংল্যান্ডের সস্তা কাপড় ও উপনিবেশিকদের অত্যাচারের কারণে আঠারো শতকের শেষার্ধে বাংলায় মসলিন বয়ন বন্ধ হয়ে যায়।

ভারতে বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে এবং বাংলাদেশে একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে পুনরায় মসলিন বুননের উদ্যোগ গৃহীত হয়, এবং এই শিল্পকে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ঢাকাই মসলিন এবং বাংলার মসলিন যথাক্রমে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসাবে এবং ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে।

শব্দের উৎস

বাংলা মসলিন শব্দটি আরবি, ফার্সি কিংবা সংস্কৃতমূল শব্দ নয়। এস. সি. বার্নেল ও হেনরি ইউল নামের দুজন ইংরেজ কর্তৃক প্রকাশিত অভিধান 'হবসন জবসন'-এ উল্লেখ করা হয়েছে মসলিন শব্দটি এসেছে 'মসুল' থেকে। ইরাকের এক বিখ্যাত ব্যবসাকেন্দ্র হল মসুল। এই মসুলেও অতি সূক্ষ্ম কাপড় প্রস্তুত হত। এই 'মসুল' এবং 'সূক্ষ কাপড়' -এ দুয়ের যোগসূত্র মিলিয়ে ইংরেজরা অতিসূক্ষ্ম কাপড়ের নাম দেয় 'মসলিন'। অবশ্য বাংলার ইতিহাসে 'মসলিন' বলতে বোঝানো হয় তৎকালীন ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে উৎপাদিত অতি সূক্ষ্ম এক প্রকার কাপড় |

ইতিহাস

ভারতীয় সূক্ষ্ম ও মিহি সুতি বস্ত্র (মসলিন) প্রাচীনতম নমুনাটি ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মমির শবাচ্ছাদনবস্ত্র হিসাবে মিশরে পাওয়া গিয়েছিল। দ্য পেরিপ্লাস অফ দ্য ইরিথ্রিয়ান সি (৬৩ খ্রি.) গ্রন্থে ভারতীয় তুলার প্রথম বাণিজ্যিক উল্লেখ পাওয়া যায়। উক্ত গ্রন্থে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইউরোপে মসলিম জাতিয় সূক্ষ্ম ও মিহি সুতি বস্ত্র রপ্তানির উল্লেখ রয়েছে। ভারতের পূর্ব তথা বাংলা (বঙ্গ) এবং উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে মসলিন উৎপাদিত হত, তবে গুণোমানের ক্ষেত্রে বাংলার মসলিন ছিল শ্রেষ্ঠ। গ্রন্থটির বিবরণ অনুসারে, বাংলার গঙ্গা বন্দর থেকে ইউরোপের বণিকগণ মসলিন সংগ্রহ করত। প্রথম খ্রিস্টাব্দের প্রথম শতকে রোম সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে অভিজাত রোমান নারীরা মসলিন পরে দেহসৌষ্ঠব প্রদর্শন করতে ভালোবাসতেন। গ্রন্থটিতে মোটা ধরনের মসলিনকে মলোচিনা, প্রশস্ত ও মসৃণ মসলিনকে মোনাচি এবং সর্বোৎকৃষ্ট মসলিনকে গেনজেটিক নামে উল্লেখ করা হয়েছে। নবম শতকে রচিত আরব ভৌগোলিক সোলাইমানের 'সিলসিলাত উত তাওয়ারীখে 'রুমি' নামক একটি রাজ্যের বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে এমন সূক্ষ্ম ও মিহি সুতি বস্ত্র পাওয়া যেত যে, ৪০ হাত লম্বা ও ২ হাত চাওড়া। এক টুকরো কাপড় আংটির ভিতর দিয়ে অনায়াসে নাড়াচড়া করা যেতো। তৎকালীন এই বস্ত্র তিনি সেখানে ব্যতীত আর কোথাও দেখেন নি। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে ও তার পরে মসুলে খুব সূক্ষ্ম সুতি কাপড় তৈরি করা হত। আরব বণিকরা এটিকে পণ্য হিসেবে ইউরোপে নিয়ে যায়, এবং মন্ত্রমুগ্ধ ইউরোপীয়রা একে মসলিন বলে ডাকত; এর পর থেকেই অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুন্দর সুতির কাপড় মসলিন নামে পরিচিত হতে শুরু করে। চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলায় আগত মরক্কো দেশিয় পর্যটক ইবনে বতুতা তার কিতাবুর রেহালায় গ্রন্থে সোনারগাঁওয়ে তৈরি সুতি বস্ত্রের বিশেষ প্রশংসা করেন। পঞ্চদশ শতকে বাংলায় আগত চীনা লেখকগণ সুতি বস্ত্রের ভুয়সী প্রশংসা করেন।

বাংলায় ষোড়শ থেকে আঠারো শতকের মধ্যে মসলিন শিল্পের বিকাশ ঘটে। এই সময়ে বাংলার প্রধান মসলিন উৎপাদন কেন্দ্রগুলি ছিল ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা, শান্তিপুর, মালদা ও হুগলি। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়, ইসলাম খান চিশতী ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করলে ঢাকা বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে প্রসিদ্ধতা লাভ করে। এই সময়ে ঢাকায় উৎপাদিত মসলিনের উৎকৃষ্টতা লাভ করেছিল, এবং এখানে উৎপাদিত মসলিন ঢাকাই মসলিন নামে জগত বিখ্যাত হয়। মোগল সম্রাট আকবরের সভাসদ আবুল ফজল সোনারগাঁওয়ে প্রস্তুতকৃত এই সূক্ষ্ম সুতি বস্ত্রের প্রশংসা করেছিলেন। এভাবে সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে বাংলার রাজধানী ঢাকায় ইউরোপিয় ব্যবসায়ীরা বাংলায় আসা শুরু করেন। এই সকল বণিকগণ ইউরোপে রপ্তানি করার জন্য বাংলা থেকে সুতি বস্ত্র ও মসলিন সংগ্রহ করত। এসকল বণিক ও কোম্পানিগুলোর তৎকালীন দলিল-দস্তাবেজ এবং ঐ সমকালীন ইউরোপীয় লেখকদের বিবরণে মসলিন সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।

মুর্শিদাবাদ বাংলার রাজধানী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরে কাশিমবাজার—মুর্শিদাবাদ শহর থেকে দক্ষিণে ভাগীরথীর তীরবর্তী একটি ছোট শহর ছিল, বর্তমানে বহরমপুর পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত—হয়ে ওঠে একটি রেশম ও সুতি বস্ত্র ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র। ভাগীরথীর যে শাখাটি বিভক্ত হয়ে জলঙ্গীতে মিলিত হয়েছিল তাকে বলা হত কসিমবাজার নদী, এবং পদ্মা, ভাগীরথী ও জলঙ্গী দ্বারা বেষ্টিত ত্রিকোণ ভূমিকে কসিমবাজার দ্বীপ বলা হত। এটি মসলিন ও রেশমের জন্য একটি বড় বাণিজ্য দ্বীপ ছিল এবং বিভিন্ন ইউরোপীয় বণিকদের বাণিজ্য কেন্দ্র (কুঠি) ছিল। ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে, স্ট্রেয়নশাম মাস্টার বলেছিলেন যে মালদা, শান্তিপুর, হুগলি প্রভৃতি স্থানে মসলিন উৎপাদন করা হত। অদ্বৈতাচার্য গোস্বামী রচিত শান্তিপুর পরিচয় গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে উল্লেখ করা হয়েছে—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উনবিংশ শতাব্দীর পারম্ভে বাৎসরিক ১,৫০,০০০ পাউণ্ড মুল্যের মসলিন ক্রয় করতেন।

হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে, জেমস টেইলরের রচনা অবলম্বনে ইতিহাসবিদ আব্দুল করিম তার ঢাকাই মসলিন গ্রন্থে উদ্বৃতি পেশ করেন। এছাড়াও তিনি উল্লেখ করেন যে, সমসাময়িক লেখকদের (যেমন, জেমস টেলর, বোল্ট, জন টেলর প্রমূখ) বিবরণের অভাবে প্রকৃতপক্ষে মোগল আমলে মসলিন কত সূক্ষ্ম ও মিহি ছিল তার কোন সঠিক ও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। ইংরেজ ইতিহাসবিদদের লেখাতে এ বিষয়ে কিছু মতামত পাওয়া গেলেও সেগুলো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। কারণ, তাদের কেউই মোগল আমলের স্বর্ণযুগ দেখেনি। এছাড়াও তাদের মাঝে পরস্পর বিরোধী অসংখ্য মতানৈক্যের ছড়াছড়ি লক্ষ্যণীয়। তারা এমন সময় বাংলায় আসেন যখন বাংলায় মসলিন শিল্প বিলুপ্তির পথে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তৈরি অর্ধ-টুকরা একখানি মসলিন (১০গজ × ০১গজ) ১৮৫১ সালে বিলেতের প্রদর্শনীতে প্রদর্শন করা হয়েছিল, যার ওজন ছিলো আট তোলা। পাশাপাশি, ঢাকা জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত মসলিন খানির দৈর্ঘ্যও ১০ গজ এবং চওড়া ১ গজ, এর ওজন মাত্র ৭ তোলা। তাহলে ঢাকার মসলিন মোগল শিল্পের স্বর্ণযুগে যে, আরো সূক্ষ্মভাবে তৈরি করা যেতো সেটা সহজেই অনুমান করা যায়।

ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা ভারতীয় তুলা থেকে বোনা ব্রিটিশদের মিলের তৈরি সস্তা কাপড়ের প্রচলনের জন্য পরিকল্পিতভাবে মসলিন বুনন ধ্বংস করেছিল। ভারতে ব্রিটিশশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত করা বস্ত্রের উপরে ৭০ হতে ৮০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, যেখানে ব্রিটেনে প্রস্তুত-করা আমদানীকৃত কাপড়ের উপরে মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ কর ছিল। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের তাঁতশিল্পে ধস নামে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা মসলিন উৎপাদন বন্ধ করার জন্য মসলিন বয়নকারী তাঁতিদের হাতের বুড়ো আঙুল কেটে দিয়েছিল। তবে অধুনা অন্য আরেকটি দাবি বেশ যৌক্তিকভাবে সামনে উঠে এসেছে, তা হল — তাঁতিদের হাত ব্রিটিশরা নয়, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের আঙ্গুল কেটে নিত, যাতে এই তাঁতের কাজ আর না করতে হয়। হুমকিপ্রাপ্ত অনেক তাঁতি পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে পালিয়ে এসে পশ্চিমবঙ্গের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলিতে বসতি স্থাপন করে, যা বাংলার সুতি পণ্যের জন্য বিখ্যাত। মসলিন তাঁতিরা তাদের পরিচয় গোপন করার জন্য মোটা সুতা ব্যবহার করে কাপড় বুনতে শুরু করেছিল। মসলিন বুনন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

বিবরণ

মসলিন প্রস্তুত করা হত পূর্ব বাংলার সোনারগাঁও অঞ্চলে। কথিত আছে যে মসলিনে তৈরি করা পোশাকসমূহ এতই সূক্ষ্ম ছিল যে ৫০ মিটার দীর্ঘ মসলিনের কাপড়কে একটি দিয়াশলাই বাক্সে ভরে রাখা যেত। সেইসময়ে এক গজ ঢাকাই মসলিনের দাম ছিল ৫০ থেকে ৪০০ পাউণ্ড, যা আজকের মূল্যমানে ৭,০০০ থেকে ৫৬,০০০ পাউণ্ড। তখনকার সবচেয়ে ভাল সিল্কের চাইতেও এই মসলিন ছিল ২৬ গুণ বেশি দামী।

মসলিনের পার্থক্য করা হত সূক্ষ্মতা, বুননশৈলী আর নকশার পার্থক্যে। এরই প্রেক্ষিতে বিভিন্ন প্রকার মসলিনের আলাদা আলাদা নাম হয়ে যায়।