· মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ · ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ ·
নিউজ →
বাংলাদেশের সেরা · রেকর্ড ও স্থাপনা

মেঘনা নদী

Meghna River

মেঘনা — দেশের সবচেয়ে প্রশস্ত নদী

মেঘনা নদী বা মেঘনা আপার নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও ভোলা জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ১৫৬ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩৪০০ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। মেঘনা চাঁদপুরের মোহনা থেকে শুরু করেই সবথেকে বেশি খরস্রোতা হয়েছে এবং মেঘনা ভোলার শুরু থেকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত প্রায় ১০০কি:মি: প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা "পাউবো" কর্তৃক মেঘনা আপার নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী নং ১৭। মেঘনা বাংলাদেশের গভীরতম ও প্রশস্ততম নদী এবং অন্যতম বৃহৎ ও প্রধান নদী।

উৎপত্তি ও গতিপ্রকৃতি

মনিপুর এর পার্বত্য অঞ্চল থেকে 'বরাক' নদী উৎপন্ন হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সিলেট সীমান্তে আসাম এর করিমগঞ্জ এর কাছে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে। তারপর নদী দুটো সিলেট বিভাগ এর চার জেলার উপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে। সিলেট বিভাগের মধ্যেই মেঘালয় থেকে আসা ডাউকি নদী, বাউলাই নদী সুরমার সাথে এবং পার্বত্য ত্রিপুরা থেকে আসা মনু নদী, খোয়াই নদী কুশিয়ারার সাথে মিলিত হয়। হবিগঞ্জ জেলার ও সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্তে সুরমা ও কুশিয়ারার স্রোত এক হয়ে কালনী নামে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাজিতপুর উপজেলা ও সরাইল উপজেলা এর মধ্যে এসে মেঘনা নাম ধারণ করেছে। ভৈরব বাজার এর নিকটে এটির সাথে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ মিলিত হয়েছে । এর কিছু দূরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার দূর্গারামপুর গ্রামে তিতাস নদী এটির সাথে মিলিত হয়। আরো দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে চাঁদপুরের কাছে বড়স্টেশন নামক এলাকার তিন নদীর মোহনায় পদ্মা নদীতে এসে মিলিত হয়েছে। আরো দক্ষিণে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ভোলা দ্বীপের মধ্য দিয়ে মেঘনা নদী মেঘনা লোয়ার নদী নামে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। সুরমাসহ মেঘনা নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৫০ মাইল। চাঁদপুরের কাছে পদ্মা-মেঘনার মিলিত ধারাটি মোহনা নামে পরিচিত। এখান থেকে আনুমানিক ৯০ মাইল দক্ষিণে চারটি মোহনা পথে মেঘনা বঙ্গোপসাগরে মিলেছে। এগুলোর স্থানীয় নাম তেঁতুলিয়া, শাহবাজপুর, সন্দ্বীপ ও হাতিয়া। বাংলাদেশের সবচেয়ে গভীরতম এবং দীর্ঘতম নদীও মেঘনা।

অন্যান্য তথ্য

মেঘনা পৃথিবীর বড় নদীগুলোর মতোই অনেক বেশি বৃষ্টির পানি বহন করে। এই নদী সুরমা, কুশিয়ারা, খাসিয়া-জয়ন্তীয়া পাহাড়, শিলং উপত্যকা ও চেরাপুঞ্জির বৃষ্টির পানি বহন করে আনে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টির বিপুল জলরাশির জন্য সিলেটে বড় বড় বিল বা হাওর তৈরি হয়েছে। আর এ কারণে মেঘনা খুব গভীর ও খরস্রোতা। ঢল বা বন্যার জন্য মেঘনা বিখ্যাত। বৃষ্টির পানি যখন খুব দ্রুত মোহনার কাছে পৌঁছাতে পারে না তখনই এর দু'কূল ছাপিয়ে বন্যা হয়। চাঁদপুরের কাছে পদ্মা-মেঘনার মিলনস্থলে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যায়। এই ইলিশ অত্যন্ত সুস্বাদু। এজন্য চাঁদপুরের ইলিশ বিশ্ববিখ্যাত। কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দিতে মেঘনা নদীর উপর সুদীর্ঘ মেঘনা-গোমতী সেতুর অবস্থান। এছাড়াও ভৈরব ও আশুগঞ্জ রেলওয়ে সেতু এ নদীর উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু।

সুরমা নদীর তীরে কানাইঘাট, গোলাপগঞ্জ, সিলেট, ছাতক, সুনামগঞ্জ, দিরাই, মারকুলী প্রসিদ্ধ শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্র। কুশিয়ারার তীরে জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, আজমীরগঞ্জ, শাল্লা, ভৈরব বাজার ও চাঁদপুর মেঘনার তীরে বিখ্যাত শহর ও বন্দর।

সাহিত্যে মেঘনা নদী

মেঘনা তার দু'তীরের মানুষকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাই বাংলা সাহিত্যে গান-কবিতা-কথায় অনিবার্যভাবে মেঘনার প্রসঙ্গ এসেছে। কবি আহসান হাবিবের একটি বিখ্যাত কবিতা।

আমি মেঘনা নদীর নেয়ে।

আমি বেড়াই হেসে খেলে।

মেঘনা নদীর নেয়ে আমি, মেঘনা পাড়ে বাড়ি।

ইচ্ছে হলেই এপার থেকে ওপারে দেই পাড়ি।

তালে তালে তালের নৌকা দু'হাতে যাই বেয়ে

লেখক হুমায়ুন কবিরের মেঘনার ঢল একটি বিখ্যাত কবিতা। এ কবিতায় মেঘনার প্রাসঙ্গিকতা এসেছে চমৎকারভাবে।

শোন মা আমিনা, রেখে দে রে কাজ ত্বরা করে মাঠে চল,

এল মেঘনার জোয়ারের বেলা এখনি নামিবে ঢল।

মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা

করিস না দেরি- আসিয়া পড়িবে সহসা অথই জল

মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা মেঘনায় নামে ঢল।

এখনো যে মেয়ে আসে নাই ফিরে- দুপুর যে বয়ে যায়।

ভরা জোয়ারের মেঘনার জল কূলে কূলে উছলায়।

দেখতো গোহালে গরুগুলো রেখে গিয়েছে কি ও পাড়ায়?

এখনো ফিরিয়া আসে নাই সে কি? দুপুর যে বয়ে যায়।.

শামসুর রাহমান তাঁর প্রিয় স্বাধীনতা কবিতায় লিখেছেন,

কল-অলা এক নায়ে।

পাড়াতলী গাঁয়ে।