- আপনি ভাবছেন টাকাটা ব্যাংকের ভল্টে নিরাপদে রাখা আছে।
- কিন্তু সত্যি বলতে, কয়েক দিনের মধ্যেই আপনার সেই টাকার বড় অংশ চলে যাবে অন্য কারো হাতে, কোনো কারখানায়, কোনো দোকানে, হয়তো কোনো বাড়ি তৈরির কাজে।
- এটাই আধুনিক অর্থব্যবস্থার জাদু, আবার এটাই তার ঝুঁকি।
ধরুন, আজ আপনি ব্যাংকে এক লাখ টাকা জমা দিলেন। কাউন্টারে রসিদ নিলেন, বাড়ি ফিরলেন। আপনি ভাবছেন টাকাটা ব্যাংকের ভল্টে নিরাপদে রাখা আছে। কিন্তু সত্যি বলতে, কয়েক দিনের মধ্যেই আপনার সেই টাকার বড় অংশ চলে যাবে অন্য কারো হাতে, কোনো কারখানায়, কোনো দোকানে, হয়তো কোনো বাড়ি তৈরির কাজে। এটাই আধুনিক অর্থব্যবস্থার জাদু, আবার এটাই তার ঝুঁকি। আমি কালারস অব বাংলাদেশ থেকে বলছি। আজ আমরা সহজ ভাষায় দেখব, বাংলাদেশের পুরো ফাইন্যান্স আর ব্যাংকিং ব্যবস্থা আসলে কীভাবে কাজ করে। কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করে, টাকা কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়, আর কোথায় কোথায় দুর্বলতা। প্রথমে পুরো ছবিটা দেখি। বাংলাদেশের অর্থব্যবস্থায় কয়েকটি বড় অংশ আছে। ব্যাংক, ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল আর্থিক সেবা, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি আর শেয়ারবাজার। আর প্রতিটির ওপর আছে একজন নিয়ন্ত্রক, যাকে বলা হয় রেগুলেটর।
আরও পড়ুনগ্রামীণ ঋণে বাড়ছে কিস্তির চাপ, আয়ের ৭৯% খরচ হচ্ছে পরিশোধেব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর মোবাইল আর্থিক সেবা দেখে বাংলাদেশ ব্যাংক। শেয়ারবাজার দেখে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, সংক্ষেপে বিএসইসি। বীমা খাত দেখে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, আইডিআরএ। আর ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান দেখে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি, এমআরএ। সবার ওপরে নীতি নির্ধারণে আছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এই ব্যবস্থার হৃদয় হলো বাংলাদেশ ব্যাংক, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর কাজ অনেকগুলো। দেশের টাকা ছাপানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সামলানো, আর সব ব্যাংকের অভিভাবক হিসেবে নিয়ম তৈরি ও তদারকি। সরকারের ব্যাংক হিসেবেও কাজ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো পলিসি রেট, বা নীতি সুদহার। এটা সেই হার, যে হারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদে টাকা ধার নেয়। এখন এই হার সাড়ে নয় শতাংশ। এই হার বাড়ালে ঋণ দামি হয়, বাজারে টাকার প্রবাহ কমে, দাম কমার চাপ তৈরি হয়। আর কমালে ঋণ সস্তা হয়, বিনিয়োগ বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেকটি বড় দায়িত্ব রিজার্ভ। আগস্ট দুই হাজার ছাব্বিশে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল সাঁইত্রিশ বিলিয়ন ডলারের বেশি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব পদ্ধতিতে প্রায় সাড়ে বত্রিশ বিলিয়ন। এই রিজার্ভ দিয়েই দেশ তেল, গম, যন্ত্রপাতি আমদানি করে, বিদেশি ঋণ শোধ করে। এবার ব্যাংকের কথা। দেশে এখন ষাটের মতো তফসিলি ব্যাংক। এর মধ্যে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বেসরকারি প্রচলিত ব্যাংক, শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক, বিদেশি ব্যাংক আর বিশেষায়িত ব্যাংক, যেমন কৃষি ব্যাংক। মার্চ দুই হাজার ছাব্বিশে ব্যাংকগুলোতে মোট আমানত ছিল একুশ লাখ আটান্ন হাজার কোটি টাকা। তাহলে ব্যাংক টাকা আয় করে কীভাবে? খুব সহজ। ব্যাংক আপনার কাছ থেকে টাকা নেয় একটি হারে, ধরুন সাত শতাংশ মুনাফা দিয়ে। আর সেই টাকা ঋণ দেয় বেশি হারে, ধরুন বারো শতাংশ সুদে। মাঝের পার্থক্যটাই ব্যাংকের আয়ের মূল উৎস, যাকে বলা হয় স্প্রেড। এর সাথে আছে বিভিন্ন সেবার ফি আর কমিশন।
তবে আপনার পুরো টাকাই ঋণ দেওয়া যায় না। নিয়ম অনুযায়ী আমানতের একটি অংশ ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নগদ জমা রাখতে হয়, আর আরেকটি অংশ রাখতে হয় সরকারি বন্ডের মতো সহজে নগদ করা যায় এমন সম্পদে। যাতে আমানতকারীরা টাকা তুলতে এলে ব্যাংক দিতে পারে। আর ব্যাংকের নিজের মূলধনও রাখতে হয় একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে, যাতে ক্ষতি হলে তা সামলানো যায়। এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে। আপনার এক লাখ টাকার বড় অংশ যখন ঋণ হিসেবে একজন ব্যবসায়ীর কাছে যায়, তিনি সেটা দিয়ে মাল কেনেন। বিক্রেতা আবার সেই টাকা অন্য ব্যাংকে জমা রাখেন। সেই ব্যাংক আবার তার একটা অংশ ঋণ দেয়। এভাবে এক লাখ টাকা ঘুরে ঘুরে অর্থনীতিতে কয়েক গুণ লেনদেন তৈরি করে। একে বলে মানি মাল্টিপ্লায়ার। ব্যাংকের পাশাপাশি আছে ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রায় পঁয়ত্রিশটি। এরা লিজিং, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ আর মেয়াদি আমানত নিয়ে কাজ করে, কিন্তু ব্যাংকের মতো চলতি হিসাব খুলতে বা চেক দিতে পারে না। গত এক দশকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বড় অনিয়মের ঘটনায় এই খাতের অনেক আমানতকারী টাকা ফেরত পেতে ভোগান্তিতে পড়েছেন।
এরপর আসে মোবাইল আর্থিক সেবা, যা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্যের গল্পগুলোর একটি। দেশে এখন চব্বিশ কোটির বেশি মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাকাউন্ট। এক মাসেই এই খাতে লেনদেন হয় দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি। গ্রামের যে মানুষটির কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই, তিনিও এখন মোবাইলে টাকা পাঠান, বিল দেন, কেনাকাটা করেন। আর আছে ক্ষুদ্রঋণ, যে খাতে বাংলাদেশ সারা পৃথিবীকে পথ দেখিয়েছে। এমআরএর লাইসেন্সপ্রাপ্ত সাতশোর বেশি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান সারা দেশে কাজ করে, যাদের ঋণগ্রহীতা তিন কোটির বেশি, যার বড় অংশ নারী। এর বাইরে নিজস্ব আইনে চলে গ্রামীণ ব্যাংক। গ্রামের অর্থনীতিতে এই খাতের ভূমিকা বিশাল। অর্থব্যবস্থার আরেকটি অংশ শেয়ারবাজার। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ আর চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে কোম্পানিগুলো শেয়ার বিক্রি করে মূলধন সংগ্রহ করে। আদর্শভাবে শেয়ারবাজার হওয়ার কথা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি অর্থের বড় উৎস। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো বেশিরভাগ ব্যবসা দীর্ঘমেয়াদি অর্থের জন্যও ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল, যা ব্যাংক খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
বীমা খাতেও আছে আশির মতো জীবন ও সাধারণ বীমা কোম্পানি। কিন্তু দেশের মোট অর্থনীতির তুলনায় বীমার ব্যবহার এখনো খুব কম। দাবি পরিশোধে দেরি আর আস্থার সংকট এই খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। আইডিআরএ কয়েকটি কোম্পানিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এবার দেখি দেশের বাইরে থেকে টাকা আসার সবচেয়ে বড় পথ, রেমিট্যান্স। দুই হাজার পঁচিশ-ছাব্বিশ অর্থবছরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন রেকর্ড সাড়ে পঁয়ত্রিশ বিলিয়ন ডলার। এই ডলার ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে আসে, পরিবার পায় টাকা, আর ডলারটা যুক্ত হয় দেশের রিজার্ভে। অর্থাৎ একজন প্রবাসীর পাঠানো প্রতিটি ডলার একসাথে একটি পরিবার আর পুরো দেশকে শক্তি দেয়। তাহলে দুর্বলতা কোথায়? সবচেয়ে বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ। জুন দুই হাজার ছাব্বিশে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছয় লাখ সাত হাজার কোটি টাকা, মোট ঋণের প্রায় তেত্রিশ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক যে টাকা ঋণ দিয়েছে, তার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ সময়মতো ফেরত আসছে না। যখন ঋণ ফেরত আসে না, তখন আমানতকারীর টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাও কমে যায়।
এই দুর্বলতা সামলাতে কিছু বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দুর্বল পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। আর নতুন আমানত সুরক্ষা আইনে প্রতিটি ব্যাংকে একজন আমানতকারীর দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সুরক্ষিত, ব্যাংক বন্ধ হলেও সতেরো কর্মদিবসে ফেরত দেওয়ার কথা। পুরো চক্রটা তাহলে এমন। আপনি টাকা জমা রাখেন, ব্যাংক সেটা ঋণ দেয়, ব্যবসা বাড়ে, কর্মসংস্থান হয়, মানুষের আয় বাড়ে, আবার টাকা জমা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরো চক্রের গতি নিয়ন্ত্রণ করে সুদহার আর নিয়ম দিয়ে। এই চক্র ঠিকমতো ঘুরলে অর্থনীতি বাড়ে। আর কোথাও আস্থা ভাঙলে, চক্র থমকে যায়। আপনার জন্য কয়েকটি সহজ পরামর্শ। ব্যাংক বেছে নিন তার আর্থিক স্বাস্থ্য দেখে, শুধু বেশি মুনাফার হার দেখে নয়। বড় অঙ্কের সঞ্চয় একাধিক ভালো ব্যাংকে ভাগ করে রাখার কথা ভাবতে পারেন। মোবাইল আর্থিক সেবায় কখনো কাউকে পিন বা ওটিপি দেবেন না। আর যেকোনো প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখার আগে দেখে নিন সেটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত কি না। এটি সাধারণ তথ্য, ব্যক্তিগত আর্থিক পরামর্শ নয়।
টাকা শুধু কাগজ বা মোবাইলের সংখ্যা নয়। টাকা আসলে আস্থা। আপনি বিশ্বাস করেন বলেই ব্যাংকে রাখেন, ব্যাংক বিশ্বাস করে বলেই ঋণ দেয়, আর সবাই বিশ্বাস করে বলেই অর্থনীতি চলে। সেই আস্থা রক্ষা করাই বাংলাদেশের অর্থব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এমন সহজ ব্যাখ্যা পেতে সাবস্ক্রাইব করুন কালারস অব বাংলাদেশ।
মূল তথ্য
- পলিসি রেট ৯.৫% (অক্টোবর–ডিসেম্বর ২০২৬)
- বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ $৩৭.২৪ বিলিয়ন (আগস্ট ২০২৬)
- ব্যাংকে মোট আমানত ২১.৫৮ লাখ কোটি টাকা (মার্চ ২০২৬)
- মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাকাউন্ট ২৪.৫ কোটির বেশি
- রেকর্ড রেমিট্যান্স $৩৫.৫৬ বিলিয়ন (অর্থবছর ২০২৬)
- খেলাপি ঋণ ৬.০৭ লাখ কোটি টাকা, মোট ঋণের ৩২.৭৮% (জুন ২০২৬)
- আমানত সুরক্ষা: প্রতি ব্যাংকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত
পুরো ডকুমেন্টারি দেখুন উপরের ভিডিওতে, অথবা কালারস অব বাংলাদেশের ইউটিউব চ্যানেলে।
সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আইডিআরএ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি, আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬, দেশের শীর্ষ অর্থনৈতিক সংবাদমাধ্যম।



