
কাজী নজরুল ইসলাম
Kazi Nazrul Islam
১৮৯৯ — ১৯৭৬৭৭ বছরের জীবন
বাংলাদেশের জাতীয় কবি
- কাজী নজরুল ইসলাম (২৪ মে ১৮৯৯ – ২৯ আগস্ট ১৯৭৬; ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ – ১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ।
- মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্যিক জীবনে তিনি যে বিপুল পরিমাণ সৃষ্টিশীল কাজ করেছেন তা এককথায় অতুলনীয়।
- সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও তার প্রধান পরিচয় তিনি কবি।
কাজী নজরুল ইসলাম (২৪ মে ১৮৯৯ – ২৯ আগস্ট ১৯৭৬; ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ – ১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ। মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্যিক জীবনে তিনি যে বিপুল পরিমাণ সৃষ্টিশীল কাজ করেছেন তা এককথায় অতুলনীয়। সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও তার প্রধান পরিচয় তিনি কবি। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি।
নজরুলের জীবন শুরু হয় অত্যন্ত সাধারণ পরিবেশে। স্কুলের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই ১৯১৭ সালে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। একটি মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়ে এবং শৈশবে ইসলামি শিক্ষায় দীক্ষিত হয়েও তিনি একটি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ সত্তা নিয়ে বড় হন। একই সাথে তার মধ্যে বিকশিত হয় এক বিদ্রোহী সত্তা। ১৯২২ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে রাজদ্রোহের অপরাধে কারাবন্দী করে। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন অবিভক্ত ভারতের 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি প্রায় ৪,০০০ গান রচনা ও সুরারোপ করার পাশাপাশি তিনটি উপন্যাস, উনিশটি ছোটগল্প এবং পাঁচটি প্রবন্ধ রচনা করেন।
সুগঠিত দেহ, সুস্বাস্থ্য ও প্রাণখোলা হাসির জন্য বিখ্যাত নজরুল ১৯৪২ সালে মারাত্মক স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হন। এর ফলে আকস্মিকভাবে তার সব ধরনের সক্রিয়তার অবসান ঘটে। ১৯৭৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৩৪ বছর তাকে সাহিত্যকর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে ১৯৭২ সালে তাকে সপরিবারে কলকাতা থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি প্রদান করে। এরপর ১৯৭৬ সালে তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। এখানেই তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বিংশ শতাব্দীর বাঙালির মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। তার কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে তার কবিতা ও গানের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। তিনি বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তার মানবিকতা, ঔপনিবেশিক শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধিতা এবং নারী-পুরুষের সমতার বন্দনা গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে বাঙালির মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
নজরুল ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে এক বাঙালি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। চুরুলিয়া গ্রামটি আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া ব্লকে অবস্থিত। তিনি ছিলেন পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান। তার বাবা ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাজারের খাদেম। নজরুলের তিন ভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ ছিলেন কাজী আলী হোসেন এবং দুই বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন কাজী সাহেবজান ও কনিষ্ঠ উম্মে কুলসুম। কাজী নজরুল ইসলামের ডাকনাম ছিল "দুখু মিয়া"। শৈশবে তিনি গ্রামের স্থানীয় মসজিদে মুয়াযযিনের কাজ করতেন। এছাড়া মক্তবে তিনি কুরআন, ইসলাম, দর্শন এবং ইসলামি ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন শুরু করেন। ১৯০৮ সালে তার বাবার মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। বাবার মৃত্যুর পর চরম পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে তার শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে মাত্র দশ বছর বয়সে জীবিকা অর্জনের জন্য তাকে কাজে নামতে হয়। এ সময় নজরুল মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেই মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেন। একই সাথে তিনি হাজী পালোয়ানের মাজারের সেবক এবং মসজিদের মুয়াযযিন হিসেবেও কাজ করতে থাকেন। এইসব কাজের মাধ্যমে তিনি অল্প বয়সেই ইসলামের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান, যা পরবর্তীতে তার সাহিত্যকর্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনিই প্রথম বাংলা সাহিত্যে ইসলামি চেতনার সার্থক চর্চা শুরু করেন।
তবে মক্তব, মসজিদ ও মাজারের কাজে নজরুল বেশি দিন যুক্ত ছিলেন না। বাল্যকালেই লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি একটি লেটো দলে যোগ দেন। তার চাচা কাজী বজলে করিম চুরুলিয়া অঞ্চলের লেটো দলের একজন বিশিষ্ট ওস্তাদ ছিলেন। আরবি, ফার্সি ও উর্দু ভাষায় তার ভালো দখল ছিল। তাছাড়া বজলে করিম মিশ্র ভাষায় গানও রচনা করতেন। ধারণা করা হয়, চাচার প্রভাবেই নজরুল লেটো দলে যোগ দেন। তাছাড়া সেই অঞ্চলের জনপ্রিয় লেটো কবি শেখ চকোর এবং কবিয়াল বাসুদেবের লেটো ও কবিগানের আসরে নজরুল নিয়মিত অংশ নিতেন। লেটো দলেই মূলত তার সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। এই দলের সাথে তিনি বিভিন্ন স্থানে যেতেন, অভিনয় শিখতেন এবং তাদের নাটকের জন্য গান ও কবিতা লিখতেন। নিজের কাজ ও অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্য অধ্যয়ন শুরু করেন। একই সাথে তিনি হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অর্থাৎ বিভিন্ন পুরাণ পড়তে শুরু করেন। সেই অল্প বয়সেই তিনি তার নাট্যদলের জন্য বেশকিছু লোকসংগীত রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চাষার সঙ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, শকুনীবধ, দাতা কর্ণ, কবি কালিদাস, আকবর বাদশাহ, রাজপুত্রের গান এবং বিদ্যাভূতুম। একদিকে মসজিদ, মাজার ও মক্তবের জীবন, অন্যদিকে লেটো দলের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নজরুলের পরবর্তী সাহিত্যিক জীবনে অনেক উপাদান জোগায়। নজরুল কালীদেবীকে নিয়ে প্রচুর শ্যামাসংগীতও রচনা করেন। তিনি তার শেষ ভাষণে উল্লেখ করেন, “কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কোনটাই না। আমি শুধু হিন্দু-মুসলিমকে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করানোর চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।”
১৯১০ সালে নজরুল লেটো দল ছেড়ে আবার ছাত্রজীবনে ফিরে আসেন। লেটো দলে তার প্রতিভায় সবাই কতটা মুগ্ধ হয়েছিলেন তার প্রমাণ মেলে তিনি দল ছাড়ার পর তাকে নিয়ে অন্য শিষ্যদের রচিত একটি গানে:
আমরা এই অধীন, হয়েছি ওস্তাদহীন
ভাবি তাই নিশিদিন, বিষাদ মনে।
কি দিব গুণের প্রমাণ।
এই নতুন ছাত্রজীবনে তার প্রথম বিদ্যালয় ছিল রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ উচ্চ বিদ্যালয়। এরপর তিনি ভর্তি হন মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে, যা পরবর্তীতে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন নামে পরিচিতি লাভ করে। মাথরুন স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ছিলেন কুমুদরঞ্জন মল্লিক, যিনি সেকালের একজন বিখ্যাত কবি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তার সান্নিধ্য ছিল নজরুলের অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস। কুমুদরঞ্জন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নজরুল সম্বন্ধে লিখেন,
ছোট সুন্দর চনমনে ছেলেটি, আমি ক্লাস পরিদর্শন করিতে গেলে সে আগেই প্রণাম করিত। আমি হাসিয়া তাহাকে আদর করিতাম। সে বড় লাজুক ছিল।
তবে আর্থিক অনটনের কারণে তিনি এখানে বেশি দিন পড়াশোনা করতে পারেননি। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর তাকে আবার কাজে ফিরে যেতে হয়। প্রথমে তিনি যোগ দেন বাসুদেবের কবিদলে। এরপর একজন খ্রিস্টান রেলওয়ে প্রহরীর খানসামা এবং সবশেষে আসানসোলের একটি রুটির দোকানে কাজ নেন। এভাবেই চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে তার বাল্যকাল অতিবাহিত হতে থাকে। রুটির দোকানে কাজ করার সময় আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লাহর সাথে তার পরিচয় হয়। দোকানে একা একা বসে নজরুলের লেখা কবিতা ও ছড়া দেখে রফিজউল্লাহ তার প্রতিভার পরিচয় পান। তিনিই ১৯১৪ সালে নজরুলকে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার দরিরামপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। ১৯১৫ সালে তিনি আবার রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ফিরে যান এবং সেখানে অষ্টম শ্রেণি থেকে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত তিনি এখানেই পড়াশোনা করেন। ১৯১৭ সালের শেষদিকে মাধ্যমিকের প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা না দিয়েই তিনি সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। এই স্কুলে পড়ার সময় নজরুল এখানকার চারজন শিক্ষক দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হন। তারা হলেন উচ্চাঙ্গসংগীতের শিক্ষক সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, বিপ্লবী ভাবাদর্শের নিবারণচন্দ্র ঘটক, ফার্সি সাহিত্যের হাফিজ নুরুন্নবী এবং সাহিত্যচর্চার নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
সৈনিক জীবন
১৯১৭ সালের শেষের দিকে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রথমে তিনি কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় যান। প্রশিক্ষণ শেষে করাচি সেনানিবাসে তার সৈনিক জীবন শুরু হয়। তিনি ১৯১৭ সালের শেষভাগ থেকে ১৯২০ সালের মার্চ–এপ্রিল পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি ৪৯তম বেঙ্গলি রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক থেকে পদোন্নতি পেয়ে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার হন। রেজিমেন্টের একজন পাঞ্জাবি মৌলভির কাছ থেকে তিনি ফার্সি ভাষা শেখেন। এছাড়া সহ-সৈনিকদের সাথে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সহযোগে সংগীতের চর্চা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তার গদ্য ও পদ্যের চর্চাও চলতে থাকে। করাচি সেনানিবাসে বসে নজরুল যে রচনাগুলো সম্পন্ন করেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী (প্রথম গদ্য রচনা), মুক্তি (প্রথম প্রকাশিত কবিতা) এবং হেনা, মেহের নেগার, ব্যথার দান,কবিতা সমাধি এবং ঘুমের ঘোরে ইত্যাদি গল্প। করাচি সেনানিবাসে অবস্থানকালেও তিনি কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মানসী, মর্মবাণী, সবুজপত্র, সওগাত এবং বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা। এ সময় তার কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং ফার্সি কবি হাফিজের কিছু বই ছিল। এ সূত্রে বলা যায়, নজরুলের সাহিত্যচর্চার প্রকৃত হাতেখড়ি এই করাচি সেনানিবাসেই হয়েছিল। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। এ সময় নজরুলের বাহিনীর ইরাকে যাওয়ার কথা থাকলেও যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা আর যাননি। ১৯২০ সালে যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯তম বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন।
সাংবাদিক জীবন
যুদ্ধ শেষে কলকাতায় ফিরে নজরুল ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে অবস্থিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির কার্যালয়ে বসবাস শুরু করেন। তার সাথে থাকতেন এই সমিতির অন্যতম কর্মকর্তা মুজফ্ফর আহমদ। এখান থেকেই তার সাহিত্য ও সাংবাদিকতা জীবনের মূল কাজগুলো শুরু হয়। প্রথম দিকেই বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, মোসলেম ভারত এবং উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে তার প্রথম উপন্যাস বাঁধন হারা এবং বোধন, বাদল প্রাতের শরাব, শাত-ইল-আরব, খেয়া-পারের তরণী, আগমনী, কোরবানি, ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম এবং মহররম প্রভৃতি কবিতা। এই লেখাগুলো তৎকালীন সাহিত্যসমাজে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। এর প্রেক্ষিতে কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার মোসলেম ভারত পত্রিকায় নজরুলের বাদল প্রাতের শরাব এবং খেয়া-পারের তরণী কবিতা দুটির ভূয়সী প্রশংসা করে একটি সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লেখেন। এর মাধ্যমেই দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমালোচকদের সাথে নজরুলের ঘনিষ্ঠ পরিচয় গড়ে ওঠে। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, আফজালুল হক প্রমুখের সাথে তার পরিচয় হয়। তৎকালীন কলকাতার দুটি জনপ্রিয় সাহিত্যিক আসর 'গজেনদার আড্ডা' এবং 'ভারতী আড্ডায়' অংশগ্রহণের সুবাদে তিনি অতুলপ্রসাদ সেন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, শিশিরকুমার ভাদুড়ী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু লাহিড়ী, হেমেন্দ্রকুমার রায়, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ওস্তাদ করমতুল্লা খাঁ প্রমুখের সান্নিধ্যে আসেন। ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের মধ্যে অত্যন্ত সুসম্পর্ক বজায় ছিল। কাজী মোতাহার হোসেনের সাথেও নজরুলের এক নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।





